ঢাকা, ২৫ জুন ২০২৫ – জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে দিন দিন বেড়ে চলেছে খাদ্য নিরাপত্তা সংকট। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বিস্তার, অনিয়মিত বৃষ্টি ও ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষিজ উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) এক সমীক্ষায় জানিয়েছে, ২০২৪ সালে উপকূলীয় ১২টি জেলার মধ্যে অন্তত ৭টিতে ধানের উৎপাদন কমেছে ২০ শতাংশের বেশি। বিশেষ করে সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, ভোলা ও খুলনার কিছু অঞ্চলে একাধিক মৌসুমে চাষ সম্ভব হচ্ছে না।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ড. ফারজানা রহমান বলেন, “উপকূলীয় মাটিতে লবণাক্ততার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ গুণ বেড়ে গেছে। এতে ধান, পাট, সবজি এমনকি মাছের চাষেও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। ফলস্বরূপ এলাকার মানুষ বিকল্প জীবিকার সন্ধানে স্থানান্তর হচ্ছে।”
স্থানীয় চাষিরা বলছেন, আগে যেখানে বছরে তিনবার ফসল হতো, এখন একবারও সঠিকভাবে ফসল ঘরে তোলা যাচ্ছে না। অনেকেই জমি ফেলে দিয়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা উপকূলীয় মানুষের জীবনে নতুন করে আঘাত হানে। ২০২৫ সালের মে মাসেই ঘূর্ণিঝড় ‘নির্মল’-এর আঘাতে বরগুনা ও পটুয়াখালীর বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। এতে বহু কৃষিজমি জলমগ্ন হয়ে পড়ে এবং মিষ্টি পানির পুকুরে লবণাক্ত পানি ঢুকে যায়।
পরিবেশ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকার ২০২৫–৩০ সময়কালের জন্য একটি ‘জলবায়ু সহনশীল কৃষি কর্মপরিকল্পনা’ তৈরি করেছে, যার আওতায় উপকূলীয় কৃষকদের লবণসহিষ্ণু ফসল চাষে উৎসাহিত করা হবে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে।
এছাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড উপকূলবর্তী এলাকায় নতুন করে বাঁধ নির্মাণ ও পুরাতন বাঁধ সংস্কারের কাজ শুরু করেছে, যাতে জোয়ারের পানি কৃষিজমিতে প্রবেশ না করতে পারে।
তবে গবেষকরা বলছেন, এই উদ্যোগগুলো কার্যকর করতে হলে স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা, প্রশিক্ষণ ও টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে। নইলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরণের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এক পূর্বাভাসে জানিয়েছে, যদি জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকে, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় কৃষিজ উৎপাদন আরও ৩০ শতাংশ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর ভবিষ্যতের শঙ্কা নয়, এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বাস্তব ও প্রতিদিনকার চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে নতুন জোট গঠনের আলোচনা শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিভিন্ন ইসলামী রাজনৈতিক দল ও কিছু জাতীয়তাবাদী ছোট দলের নেতৃবৃন্দ একাধিক দফায় বৈঠকে বসেছেন এবং একটি কার্যকর রাজনৈতিক জোট গঠনের বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছেন। দীর্ঘদিনের মতানৈক্য ও পারস্পরিক অনাস্থা ভুলে নেতারা এখন একটি বৃহত্তর ঐক্যের দিকে এগোচ্ছেন। বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা মনে করছেন, দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোতে বিচ্ছিন্নভাবে নির্বাচনে অংশ নিলে কোনো দলই উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারবে না। বিশেষ করে ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই জোটের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন। এতে করে নির্বাচনে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলার পাশাপাশি নিজেদের দাবি ও স্বার্থ আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন নেতৃবৃন্দ। জোট গঠনের আলোচনায় অংশ নেওয়া দলগুলো একমত হয়েছে যে, তারা জাতীয় স্বার্থ, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জনগণের অধিকার রক্ষায় একটি সমন্বিত অবস্থান গ্রহণ করবে। নির্বাচনী আসন ভাগাভাগি, প্রার্থী নির্বাচন, নীতিগত রূপরেখা ইত্যাদি বিষয়েও খসড়া আলোচনা প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। এখন অপেক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও সমঝোতা চুক্তির। তবে এই প্রক্রিয়া নিঃসন্দেহে সহজ নয়। বিভিন্ন দলের ভিন্ন মতাদর্শ, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা ও আস্থার ঘাটতি মাঝে মাঝে প্রক্রিয়াকে মন্থর করে তুলছে। তবুও বৈঠকে অংশ নেওয়া অনেক নেতাই আশাবাদী যে, বাস্তবতা ও সময়ের দাবি মেনে সবাই একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছাবেন। এই জোট গঠনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পালাবদলের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তারা যদি বৃহৎ বিরোধী শক্তির সঙ্গে নির্বাচনী সমন্বয় করতে সক্ষম হয়, তবে তা ক্ষমতাসীন দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে, একটি সুসংগঠিত ও নীতিনির্ভর জোট দেশের গণতন্ত্রের জন্যও হতে পারে ইতিবাচক বার্তা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে সমঝোতা এবং নেতৃত্বে নমনীয়তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সবাই যদি নিজ নিজ দলীয় স্বার্থ কিছুটা পেছনে রেখে সম্মিলিত লক্ষ্যে একমত হতে পারেন, তাহলে এ জোট একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বলয়ে রূপ নিতে পারে। সবদিক বিবেচনায় বলা যায়, নেত্রীমণ্ডলীর বৈঠক ও চলমান আলোচনা একটি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদি সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়, তবে অচিরেই এই নতুন জোট দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলতে পারে। জনগণের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হতে পারে এই উদ্যোগের মাধ্যমে। এখন দেখার বিষয়—এই আলোচনা কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি বাস্তবে রূপ নেয় কার্যকর এক ঐক্যে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন রোডম্যাপ প্রকাশ করেছে, যা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই রোডম্যাপে নির্বাচন আয়োজনের বিস্তারিত সময়সূচি, প্রাথমিক প্রস্তুতি, নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি এবং ভোট গ্রহণের কাঠামো স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ইসি প্রমাণ করতে চেয়েছে যে, তারা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রস্তুত। প্রকাশিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, ভোটার তালিকা হালনাগাদ থেকে শুরু করে নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি, ভোটকেন্দ্র সংস্কার, নির্বাচনী আসনের সীমা পুনঃনির্ধারণ, পর্যবেক্ষক নিবন্ধন, ইভিএম প্রস্তুতি ও নির্বাচনী কর্মীদের প্রশিক্ষণ—সবকিছুই ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। কমিশনের দাবি, এসব কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে জনগণের আস্থা ফেরানো ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবে এই রোডম্যাপ প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ক্ষমতাসীন দল এটিকে সময়োপযোগী ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, কমিশন নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে এবং এই রোডম্যাপ একটি স্থিতিশীল নির্বাচনী পরিবেশ গঠনে সহায়ক হবে। অপরদিকে, বিরোধী দলগুলো রোডম্যাপকে একতরফা ও বিভ্রান্তিকর দাবি করে বলেছে—এটি শুধু সময়ক্ষেপণের কৌশল, যেখানে প্রকৃত সমস্যার সমাধানে কোনো পদক্ষেপ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, রোডম্যাপ প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়, বরং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াই আসল চ্যালেঞ্জ। অতীতে দেখা গেছে, অনেক সময় রোডম্যাপে সুন্দর পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে তা পূর্ণরূপে কার্যকর হয়নি। বিশেষ করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরপেক্ষতা, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে রোডম্যাপ কাগজে সীমাবদ্ধ থেকেই যাবে। নির্বাচনী পরিবেশ তৈরিতে কমিশনের করণীয় অনেক। একদিকে যেমন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ চালিয়ে যাওয়া জরুরি, তেমনি প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর জনসাধারণের আস্থা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। কারণ একটি অবাধ নির্বাচন শুধু সময়সূচির ওপর নয়, বরং পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নির্ভর করে। নির্বাচন কমিশনের ভাষ্যমতে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নির্বাচনের দিন ঘোষণা করা হতে পারে। তবে এই সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ, পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর অনুমোদন এবং নির্বাচনী আইন সংশোধন—এসব বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি প্রয়োজন। রোডম্যাপে এসব বিষয় যুক্ত থাকলেও বাস্তবে কতটুকু অগ্রগতি হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। সাধারণ জনগণ এই রোডম্যাপকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও তারা চান এর বাস্তব প্রতিফলন। কারণ অতীতে নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগ ও সহিংসতার কারণে মানুষ আস্থাহীনতায় ভুগেছে। একটি অংশগ্রহণমূলক, সহিংসতামুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই পারে দেশের গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে। সবশেষে বলা যায়, নির্বাচন কমিশনের এই রোডম্যাপ রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে পারে, যদি তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয় এবং সব পক্ষ এতে আস্থা রাখে। শুধু ঘোষণা নয়, দরকার সম্মিলিত প্রয়াস ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা—যা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মূল ভিত্তি হতে পারে।