আন্তর্জাতিক

রাশিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি নিয়ে ইউক্রেনের আলোচনা জোরালো

জানিফ হাসান জুন ২৮, ২০২৫ 0

দীর্ঘ প্রায় দুই বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর অবশেষে রাশিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য নিরাপত্তা চুক্তি নিয়ে আলোচনায় বসেছে ইউক্রেন। পশ্চিমা সমর্থিত ইউক্রেনীয় প্রশাসন এখন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমাধানের দিকে অগ্রসর হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কিয়েভ এবং মস্কোর মধ্যকার আলোচনার বিষয়বস্তু এখনো পুরোপুরি প্রকাশ না হলেও, বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে—প্রস্তাবিত চুক্তিতে যুদ্ধবিরতি, নিরাপদ সীমান্ত নির্ধারণ, যুদ্ধবন্দি বিনিময় এবং পূর্ব ইউক্রেনের ভবিষ্যত রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা চলছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির দপ্তর এক বিবৃতিতে জানায়, “আমরা একটি টেকসই শান্তির পথ খুঁজছি, তবে তা হবে আমাদের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ড অক্ষুন্ন রাখার ভিত্তিতে।”

রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও আলোচনার কথা নিশ্চিত করেছে এবং একে "গঠনমূলক প্রক্রিয়া" বলে উল্লেখ করেছে। তবে তারা পশ্চিমা সামরিক প্রভাব থেকে ইউক্রেনকে মুক্ত রাখার দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে, যা এখনো সমঝোতার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

এই আলোচনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘ শান্তিপূর্ণ আলোচনার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে। তবে ন্যাটো ও যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে সতর্ক করেছে যাতে তারা চাপে পড়ে কোনও অসম চুক্তিতে না যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর এক বিবৃতিতে জানায়, “আমরা চাই ইউক্রেন স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিক, তবে মনে রাখতে হবে—শান্তি চুক্তি যেন যুদ্ধাপরাধীদের দায়মুক্তির সুযোগ না দেয়।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া বর্তমানে কৌশলগতভাবে কিছুটা দুর্বল অবস্থানে থাকলেও, যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের কিছু সাফল্যও রয়েছে। বিশেষ করে দোনেৎস্ক এবং লুহানস্ক অঞ্চলে রুশ বাহিনী আংশিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, যা আলোচনার ক্ষেত্রে তাদের দাবিকে শক্তিশালী করতে পারে।

এদিকে, ইউক্রেনের জনগণের মধ্যেও এই আলোচনাকে ঘিরে মতভেদ রয়েছে। একাংশ মনে করছে, দীর্ঘদিনের যুদ্ধক্লান্তি থেকে মুক্তির পথ এটি, অন্যদিকে অনেকে বলছে—এটি মূলত রাশিয়ার পক্ষে আত্মসমর্পণের আরেক নাম।

 

চুক্তির সম্ভাব্য কাঠামো ও চ্যালেঞ্জ

বিশ্লেষকদের ধারণা, আলোচনায় একটি অন্তর্বর্তী শান্তিচুক্তি হতে পারে, যার আওতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা হবে এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মাধ্যমে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ পর্যবেক্ষণ করা হবে। একইসঙ্গে যুদ্ধবন্দিদের বিনিময়, ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো পুনর্গঠনে সহায়তা এবং দেশান্তরিত জনগণকে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে।

তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে—ক্রাইমিয়া ও ডনবাস অঞ্চলের ভবিষ্যৎ অবস্থান নির্ধারণ। রাশিয়া ক্রাইমিয়াকে ইতোমধ্যেই তাদের অংশ বলে দাবি করে আসছে, অন্যদিকে ইউক্রেন কোনোভাবেই এই অঞ্চলগুলোর উপর রুশ আধিপত্য মেনে নিতে রাজি নয়।

মস্কোভিত্তিক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক আন্দ্রেই লুকাশেঙ্কো বলেন, “যদি উভয় পক্ষই বাস্তববাদী অবস্থান গ্রহণ করে, তবে একটি সীমিত পরিসরের চুক্তি সম্ভব হতে পারে, তবে এর জন্য উভয়পক্ষকেই কিছু ছাড় দিতে হবে।”

তবে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট—এই আলোচনা যতই অগ্রসর হোক না কেন, এটি পুরোপুরি সফল হতে হলে পশ্চিমা শক্তিগুলোর অংশগ্রহণ ও সমর্থন অপরিহার্য। কারণ ইউক্রেনের সামরিক ও আর্থিক সহায়তার বড় উৎসই হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটো।

 

এই আলোচনার পরবর্তী ধাপ কী হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য বিশ্ব সম্প্রদায় আগ্রহের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। আগামী কয়েক সপ্তাহেই হয়তো জানা যাবে—দীর্ঘ যুদ্ধের পর প্রকৃত শান্তির পথে কতটা এগোতে পারল ইউক্রেন ও রাশিয়া।

জনপ্রিয় পোস্ট
নেত্রীমণ্ডলীর বৈঠকে জোট গঠনের আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে নতুন জোট গঠনের আলোচনা শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিভিন্ন ইসলামী রাজনৈতিক দল ও কিছু জাতীয়তাবাদী ছোট দলের নেতৃবৃন্দ একাধিক দফায় বৈঠকে বসেছেন এবং একটি কার্যকর রাজনৈতিক জোট গঠনের বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছেন। দীর্ঘদিনের মতানৈক্য ও পারস্পরিক অনাস্থা ভুলে নেতারা এখন একটি বৃহত্তর ঐক্যের দিকে এগোচ্ছেন। বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা মনে করছেন, দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোতে বিচ্ছিন্নভাবে নির্বাচনে অংশ নিলে কোনো দলই উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারবে না। বিশেষ করে ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই জোটের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন। এতে করে নির্বাচনে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলার পাশাপাশি নিজেদের দাবি ও স্বার্থ আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন নেতৃবৃন্দ। জোট গঠনের আলোচনায় অংশ নেওয়া দলগুলো একমত হয়েছে যে, তারা জাতীয় স্বার্থ, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জনগণের অধিকার রক্ষায় একটি সমন্বিত অবস্থান গ্রহণ করবে। নির্বাচনী আসন ভাগাভাগি, প্রার্থী নির্বাচন, নীতিগত রূপরেখা ইত্যাদি বিষয়েও খসড়া আলোচনা প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। এখন অপেক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও সমঝোতা চুক্তির। তবে এই প্রক্রিয়া নিঃসন্দেহে সহজ নয়। বিভিন্ন দলের ভিন্ন মতাদর্শ, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা ও আস্থার ঘাটতি মাঝে মাঝে প্রক্রিয়াকে মন্থর করে তুলছে। তবুও বৈঠকে অংশ নেওয়া অনেক নেতাই আশাবাদী যে, বাস্তবতা ও সময়ের দাবি মেনে সবাই একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছাবেন। এই জোট গঠনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পালাবদলের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তারা যদি বৃহৎ বিরোধী শক্তির সঙ্গে নির্বাচনী সমন্বয় করতে সক্ষম হয়, তবে তা ক্ষমতাসীন দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে, একটি সুসংগঠিত ও নীতিনির্ভর জোট দেশের গণতন্ত্রের জন্যও হতে পারে ইতিবাচক বার্তা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে সমঝোতা এবং নেতৃত্বে নমনীয়তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সবাই যদি নিজ নিজ দলীয় স্বার্থ কিছুটা পেছনে রেখে সম্মিলিত লক্ষ্যে একমত হতে পারেন, তাহলে এ জোট একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বলয়ে রূপ নিতে পারে। সবদিক বিবেচনায় বলা যায়, নেত্রীমণ্ডলীর বৈঠক ও চলমান আলোচনা একটি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদি সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়, তবে অচিরেই এই নতুন জোট দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলতে পারে। জনগণের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হতে পারে এই উদ্যোগের মাধ্যমে। এখন দেখার বিষয়—এই আলোচনা কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি বাস্তবে রূপ নেয় কার্যকর এক ঐক্যে।

নির্বাচনের প্রস্তুতি: নির্বাচন কমিশনের নতুন রোডম্যাপ প্রকাশ

নির্বাচন কমিশন (ইসি) আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন রোডম্যাপ প্রকাশ করেছে, যা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই রোডম্যাপে নির্বাচন আয়োজনের বিস্তারিত সময়সূচি, প্রাথমিক প্রস্তুতি, নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি এবং ভোট গ্রহণের কাঠামো স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ইসি প্রমাণ করতে চেয়েছে যে, তারা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রস্তুত। প্রকাশিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, ভোটার তালিকা হালনাগাদ থেকে শুরু করে নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি, ভোটকেন্দ্র সংস্কার, নির্বাচনী আসনের সীমা পুনঃনির্ধারণ, পর্যবেক্ষক নিবন্ধন, ইভিএম প্রস্তুতি ও নির্বাচনী কর্মীদের প্রশিক্ষণ—সবকিছুই ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। কমিশনের দাবি, এসব কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে জনগণের আস্থা ফেরানো ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবে এই রোডম্যাপ প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ক্ষমতাসীন দল এটিকে সময়োপযোগী ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, কমিশন নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে এবং এই রোডম্যাপ একটি স্থিতিশীল নির্বাচনী পরিবেশ গঠনে সহায়ক হবে। অপরদিকে, বিরোধী দলগুলো রোডম্যাপকে একতরফা ও বিভ্রান্তিকর দাবি করে বলেছে—এটি শুধু সময়ক্ষেপণের কৌশল, যেখানে প্রকৃত সমস্যার সমাধানে কোনো পদক্ষেপ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, রোডম্যাপ প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়, বরং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াই আসল চ্যালেঞ্জ। অতীতে দেখা গেছে, অনেক সময় রোডম্যাপে সুন্দর পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে তা পূর্ণরূপে কার্যকর হয়নি। বিশেষ করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরপেক্ষতা, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে রোডম্যাপ কাগজে সীমাবদ্ধ থেকেই যাবে। নির্বাচনী পরিবেশ তৈরিতে কমিশনের করণীয় অনেক। একদিকে যেমন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ চালিয়ে যাওয়া জরুরি, তেমনি প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর জনসাধারণের আস্থা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। কারণ একটি অবাধ নির্বাচন শুধু সময়সূচির ওপর নয়, বরং পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নির্ভর করে। নির্বাচন কমিশনের ভাষ্যমতে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নির্বাচনের দিন ঘোষণা করা হতে পারে। তবে এই সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ, পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর অনুমোদন এবং নির্বাচনী আইন সংশোধন—এসব বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি প্রয়োজন। রোডম্যাপে এসব বিষয় যুক্ত থাকলেও বাস্তবে কতটুকু অগ্রগতি হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। সাধারণ জনগণ এই রোডম্যাপকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও তারা চান এর বাস্তব প্রতিফলন। কারণ অতীতে নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগ ও সহিংসতার কারণে মানুষ আস্থাহীনতায় ভুগেছে। একটি অংশগ্রহণমূলক, সহিংসতামুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই পারে দেশের গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে। সবশেষে বলা যায়, নির্বাচন কমিশনের এই রোডম্যাপ রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে পারে, যদি তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয় এবং সব পক্ষ এতে আস্থা রাখে। শুধু ঘোষণা নয়, দরকার সম্মিলিত প্রয়াস ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা—যা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মূল ভিত্তি হতে পারে।

More news from this Category

আরও দেখুন

Most Popular News

আরও দেখুন

0 Comments