শিক্ষা

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট: এক শিক্ষকেই সামলাচ্ছেন একাধিক শ্রেণি

Kalam Khan জুন ২৮, ২০২৫ 0

দেশের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষক সংকট একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে এই সংকট আরও প্রকট। অনেক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় একজন শিক্ষককেই একাধিক শ্রেণির পাঠদান করতে হচ্ছে। এতে করে পাঠদানের মান যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহও কমে যাচ্ছে।

 

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদ্যালয়েই শিক্ষক স্বল্পতা রয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে একটি বিদ্যালয়ে তিন থেকে চারজন শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে দেখা যায়, কোনো কোনো স্কুলে মাত্র একজন বা দুজন শিক্ষক দিয়ে পুরো বিদ্যালয় চালানো হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষককে একসঙ্গে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির পাঠদান করতে হয়, যা কোনোভাবেই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না।

 

এ ধরনের পরিস্থিতিতে শিক্ষকরা চরম মানসিক চাপের মধ্যে পড়েন। একজন শিক্ষক যখন একই সময় একাধিক শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের পড়ান, তখন স্বাভাবিকভাবেই কোনো শ্রেণির উপর পর্যাপ্ত সময় ও মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জনে ব্যর্থ হয়। এইভাবে ধাপে ধাপে শিখনের ঘাটতি তৈরি হয়, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে ভবিষ্যত শিক্ষাজীবনেও।

 

শুধু পাঠদানের ক্ষেত্রেই নয়, একজন শিক্ষককে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ, মিডডে মিল, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে সমন্বয়, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হিসাব রাখা, নানা রিপোর্ট প্রস্তুত করাসহ আরও অনেক দায়িত্ব পালন করতে হয়। এক্ষেত্রে শিক্ষক যতই আন্তরিক হোন না কেন, সীমিত জনবল ও অপ্রতুল সময়ের কারণে শিক্ষার মান উন্নয়ন অসম্ভব হয়ে পড়ে।

 

অন্যদিকে, শিক্ষার্থীরাও এই সংকটের কারণে দুর্বল ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করে। একজন শিক্ষক একসঙ্গে দুই-তিনটি শ্রেণির ক্লাস নেওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একঘেয়েমি সৃষ্টি হয় এবং তারা ধীরে ধীরে স্কুলে আসার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এর ফলে ঝরে পড়ার হারও বাড়ছে।

 

সরকার শিক্ষক নিয়োগে বিভিন্ন সময় উদ্যোগ নিলেও তা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সংকট কাটছে না। অনেক সময় নিয়োগপ্রাপ্তরাও দুর্গম এলাকায় যোগদান করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন, ফলে গ্রামাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতেই সংকট সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।

 

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দ্রুত ও কার্যকর শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করা দরকার। বিশেষ করে দুর্গম ও গ্রামীণ অঞ্চলের স্কুলগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, স্থায়ী পদ সৃষ্টি, নিয়োগপ্রাপ্তদের প্রণোদনা প্রদান এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। এছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর বিকল্প শিক্ষা পদ্ধতিও বিবেচনায় আনা যেতে পারে, যাতে শিক্ষক সংকট থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় পাঠ গ্রহণ করতে পারে।

 

প্রাথমিক স্তরেই যদি শিক্ষার্থীরা মানসম্পন্ন শিক্ষা না পায়, তবে তা পুরো শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই এখনই সময় কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার, যেন একজন শিক্ষককে আর একা একাধিক শ্রেণির ভার বইতে না হয় এবং দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে এগিয়ে যেতে পারে।

জনপ্রিয় পোস্ট
নেত্রীমণ্ডলীর বৈঠকে জোট গঠনের আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে নতুন জোট গঠনের আলোচনা শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিভিন্ন ইসলামী রাজনৈতিক দল ও কিছু জাতীয়তাবাদী ছোট দলের নেতৃবৃন্দ একাধিক দফায় বৈঠকে বসেছেন এবং একটি কার্যকর রাজনৈতিক জোট গঠনের বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছেন। দীর্ঘদিনের মতানৈক্য ও পারস্পরিক অনাস্থা ভুলে নেতারা এখন একটি বৃহত্তর ঐক্যের দিকে এগোচ্ছেন। বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা মনে করছেন, দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোতে বিচ্ছিন্নভাবে নির্বাচনে অংশ নিলে কোনো দলই উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারবে না। বিশেষ করে ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় অনেকেই জোটের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন। এতে করে নির্বাচনে শক্ত অবস্থান গড়ে তোলার পাশাপাশি নিজেদের দাবি ও স্বার্থ আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন নেতৃবৃন্দ। জোট গঠনের আলোচনায় অংশ নেওয়া দলগুলো একমত হয়েছে যে, তারা জাতীয় স্বার্থ, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জনগণের অধিকার রক্ষায় একটি সমন্বিত অবস্থান গ্রহণ করবে। নির্বাচনী আসন ভাগাভাগি, প্রার্থী নির্বাচন, নীতিগত রূপরেখা ইত্যাদি বিষয়েও খসড়া আলোচনা প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। এখন অপেক্ষা কেবল আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ও সমঝোতা চুক্তির। তবে এই প্রক্রিয়া নিঃসন্দেহে সহজ নয়। বিভিন্ন দলের ভিন্ন মতাদর্শ, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা ও আস্থার ঘাটতি মাঝে মাঝে প্রক্রিয়াকে মন্থর করে তুলছে। তবুও বৈঠকে অংশ নেওয়া অনেক নেতাই আশাবাদী যে, বাস্তবতা ও সময়ের দাবি মেনে সবাই একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছাবেন। এই জোট গঠনের মাধ্যমে রাজনৈতিক পালাবদলের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে তারা যদি বৃহৎ বিরোধী শক্তির সঙ্গে নির্বাচনী সমন্বয় করতে সক্ষম হয়, তবে তা ক্ষমতাসীন দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে, একটি সুসংগঠিত ও নীতিনির্ভর জোট দেশের গণতন্ত্রের জন্যও হতে পারে ইতিবাচক বার্তা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে সমঝোতা এবং নেতৃত্বে নমনীয়তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সবাই যদি নিজ নিজ দলীয় স্বার্থ কিছুটা পেছনে রেখে সম্মিলিত লক্ষ্যে একমত হতে পারেন, তাহলে এ জোট একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বলয়ে রূপ নিতে পারে। সবদিক বিবেচনায় বলা যায়, নেত্রীমণ্ডলীর বৈঠক ও চলমান আলোচনা একটি নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যদি সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয়, তবে অচিরেই এই নতুন জোট দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দৃশ্যমান প্রভাব ফেলতে পারে। জনগণের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা ও রাজনৈতিক সচেতনতা তৈরি হতে পারে এই উদ্যোগের মাধ্যমে। এখন দেখার বিষয়—এই আলোচনা কেবল কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি বাস্তবে রূপ নেয় কার্যকর এক ঐক্যে।

নির্বাচনের প্রস্তুতি: নির্বাচন কমিশনের নতুন রোডম্যাপ প্রকাশ

নির্বাচন কমিশন (ইসি) আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন রোডম্যাপ প্রকাশ করেছে, যা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই রোডম্যাপে নির্বাচন আয়োজনের বিস্তারিত সময়সূচি, প্রাথমিক প্রস্তুতি, নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি এবং ভোট গ্রহণের কাঠামো স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ইসি প্রমাণ করতে চেয়েছে যে, তারা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য প্রস্তুত। প্রকাশিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, ভোটার তালিকা হালনাগাদ থেকে শুরু করে নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি, ভোটকেন্দ্র সংস্কার, নির্বাচনী আসনের সীমা পুনঃনির্ধারণ, পর্যবেক্ষক নিবন্ধন, ইভিএম প্রস্তুতি ও নির্বাচনী কর্মীদের প্রশিক্ষণ—সবকিছুই ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। কমিশনের দাবি, এসব কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে জনগণের আস্থা ফেরানো ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। তবে এই রোডম্যাপ প্রকাশের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ক্ষমতাসীন দল এটিকে সময়োপযোগী ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের মতে, কমিশন নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে এবং এই রোডম্যাপ একটি স্থিতিশীল নির্বাচনী পরিবেশ গঠনে সহায়ক হবে। অপরদিকে, বিরোধী দলগুলো রোডম্যাপকে একতরফা ও বিভ্রান্তিকর দাবি করে বলেছে—এটি শুধু সময়ক্ষেপণের কৌশল, যেখানে প্রকৃত সমস্যার সমাধানে কোনো পদক্ষেপ নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, রোডম্যাপ প্রকাশ করাই যথেষ্ট নয়, বরং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াই আসল চ্যালেঞ্জ। অতীতে দেখা গেছে, অনেক সময় রোডম্যাপে সুন্দর পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে তা পূর্ণরূপে কার্যকর হয়নি। বিশেষ করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরপেক্ষতা, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং ভোটারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে রোডম্যাপ কাগজে সীমাবদ্ধ থেকেই যাবে। নির্বাচনী পরিবেশ তৈরিতে কমিশনের করণীয় অনেক। একদিকে যেমন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ চালিয়ে যাওয়া জরুরি, তেমনি প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর জনসাধারণের আস্থা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন। কারণ একটি অবাধ নির্বাচন শুধু সময়সূচির ওপর নয়, বরং পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নির্ভর করে। নির্বাচন কমিশনের ভাষ্যমতে, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নির্বাচনের দিন ঘোষণা করা হতে পারে। তবে এই সময়ের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ, পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর অনুমোদন এবং নির্বাচনী আইন সংশোধন—এসব বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি প্রয়োজন। রোডম্যাপে এসব বিষয় যুক্ত থাকলেও বাস্তবে কতটুকু অগ্রগতি হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। সাধারণ জনগণ এই রোডম্যাপকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও তারা চান এর বাস্তব প্রতিফলন। কারণ অতীতে নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের অভিযোগ ও সহিংসতার কারণে মানুষ আস্থাহীনতায় ভুগেছে। একটি অংশগ্রহণমূলক, সহিংসতামুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচনই পারে দেশের গণতান্ত্রিক ধারা বজায় রাখতে। সবশেষে বলা যায়, নির্বাচন কমিশনের এই রোডম্যাপ রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে পারে, যদি তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয় এবং সব পক্ষ এতে আস্থা রাখে। শুধু ঘোষণা নয়, দরকার সম্মিলিত প্রয়াস ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা—যা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মূল ভিত্তি হতে পারে।

More news from this Category

আরও দেখুন

প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট: এক শিক্ষকেই সামলাচ্ছেন একাধিক শ্রেণি

কারিগরি শিক্ষার প্রসারে প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ

অনলাইন ক্লাসের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমছে, বাড়ছে শিখন ঘাটতি

ইউনিফর্ম ও উপবৃত্তি না পেয়ে শিক্ষার্থীদের স্কুলে অনুপস্থিতির হার বাড়ছে

সরকারি স্কুলে প্রথমবারের মতো ডিজিটাল হাজিরা চালু, নজরদারিতে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা বাতিল, চালু হচ্ছে কেন্দ্রীয় আবেদন ও মেধাতালিকা

অনলাইন শিক্ষার ভবিষ্যৎ: ক্লাসরুম কি চিরতরে বদলে যাচ্ছে?

অনলাইন শিক্ষার ভবিষ্যৎ: ক্লাসরুম কি চিরতরে বদলে যাচ্ছে?

নতুন শিক্ষানীতিতে বড় পরিবর্তন: শিক্ষার্থীদের জন্য কী অপেক্ষা করছে?

নতুন শিক্ষানীতিতে বড় পরিবর্তন: শিক্ষার্থীদের জন্য কী অপেক্ষা করছে?

Most Popular News

আরও দেখুন

0 Comments